মানুষের ভাগ্য কপালে লেখা থাকে না, ভাগ্য লেখা থাকে পরিশ্রমের মধ্যে। এটাই প্রমাণ করেছেন শাহ্ জামাল ভূঁইয়া। শিল্পোদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি।
শাহ জামাল ভূঁইয়ার জন্ম ১৯৭৪ সালে ঢাকার তেজগাঁও শিল্প এলাকায়। তার পিতা কামিজ উদ্দিন ভূঁইয়া, মায়ের নাম ফাতেমা বেগম। কেউ বেঁচে নেই। তাঁদের স্মৃতি আছে তার মনে, স্মৃতি হৃদয় খুঁড়ে খুঁড়ে বেদনা জাগায়, কাজে অনুপ্রেরণা জোগায়। পিতা-মাতার দোয়া নিয়ে শাহ্ জামাল ভূঁইয়া প্রবেশ করেছেন কর্মজীবনে। তিনি তারুণ্যের শুরুতেই গভীরভাবে অনুধাবন করেছেন-পরিশ্রমই হচ্ছে সাফল্যের চাবিকাঠি। তাই একাগ্রচিত্তে পরিশ্রম করেছেন। অর্জন করেছেন অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতাকেই তিনি দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগিয়েছেন। নিজের ভাগ্য নিজে গড়ে নিয়েছেন।
শাহ্ জামাল ভূঁইয়া শুরুতে এক বছর কাজ করেছেন লেদ মেশিনের মিস্ত্রি হিসেবে। হাতে-কলমে কাজ শিখেছেন। অর্জন করেছেন দক্ষতা। এরপর কাজ করেছেন আমেরিকান এক্সপার্টের সঙ্গে ফিডারম্যান হিসেবে। ১৯৯৩ সালে আহাম্মদ মোল্ডিং নামে একটি কারখানায় ঢালাই নির্মাণের মাধ্যমে শুরু করেছেন তার ক্যারিয়ার। এই কাজে নিজের টেকনিক্যাল অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতেই চেষ্টা করেছেন। তাতে তিনি সফলও হয়েছেন। তাই শাহ্ জামাল ভূঁইয়া নিজেকে একজন দক্ষ টেকনিশিয়ান এবং ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন। ১৯৯৬ সালে তিনি ‘কাই বাংলাদেশ’ নামে একটি অ্যালুমিনিয়াম কোম্পানিতে কাজ শুরু করেন। স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে অনেক পথ অতিক্রম করার পর একটি নিজস্ব ঠিকানা খুঁজে পেতে হয়। অবশেষে সেই ঠিকানা স্পর্শ করতে পেরেছেন আত্মপ্রত্যয়ী শাহ্ জামাল ভূঁইয়া। তিনি ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠা করেন মেসার্স ভূঁইয়া ইঞ্জিনিয়ারিং নামে একটি কারখানা। এই কারখানায় তৈরি হয় থাই অ্যালুমিনিয়াম মেশিনারিজ, কনভেয়ার টেবিল, স্ট্রেচার মেশিন, ব্লেড ওভেন, এজিং ফার্নিশ ডাই ওভেন, রেপিং মেশিনসহ সব ধরনের নতুন মেশিন।
কাই অ্যালুমিনিয়াম কোম্পানি কর্তৃপক্ষ শাহ্ জামাল ভূঁইয়ার কর্মদক্ষতা দেখে মুগ্ধ হয়েছেন। এই সম্পর্কে বিশিষ্ট টেকনিশিয়ান শাহ্ জামাল ভূঁইয়া বলেন, প্রতিটি ক্ষেত্রে কাজের জন্য প্রয়োজন অন্যের আস্থা অর্জন করা। আস্থা অর্জনের পর যদি সততার সঙ্গে কাজ করা যায়, কঠোর পরিশ্রম করা যায় এবং দক্ষতার পরিচয় দেওয়া যায়, তবে তাকে কেউ পিছু টেনে রাখতে পারে না। এই জন্য আমি আমার কাজের ব্যাপারে সৎ, কর্তব্যনিষ্ঠা এবং পরিশ্রমী থেকেছি। সবসময়েই সহকর্মী ও বন্ধু-বান্ধবদের কাছে আমার কাজের প্রশংসা পেয়েছি। তাই আমি তাদের কাছে কৃতজ্ঞ। তারা আমার সততা ও পরিশ্রমের মূল্যায়ন করেছেন।
উদ্যোক্তা শাহ্ জামাল
শাহ্ জামাল ভূঁইয়া একজন দক্ষ টেকনিশিয়ান। এ ক্ষেত্রে তিনি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি অর্জন করেননি, কাজ শিখেছেন হাতে-কলমে। তাই নিজের কাজের জন্য অন্যের দ্বারস্থ হতে হয়নি।
একই সঙ্গে তিনি একজন ব্যবসায়ী। এই দুই অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে গড়ে তুলেছেন নিজের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। ক্ষুদ্র শিল্পের জগতে তার রয়েছে ব্যাপক সুনাম।
অনেকে ক্ষুদ্র শিল্প জগতে কাজ শিখেছেন এবং দক্ষতা অর্জন করেছেন। কিন্তু তারা ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসা করার সাহস পাননি। শাহ্ জামাল ভূঁইয়া একজন সাহসী মানুষ, তাই ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসায় নেমেছেন। সফলও হয়েছেন। এই সম্পর্কে তিনি বলেন, ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত আমি একটি অ্যালুমিনিয়াম কারখানায় কাজ করার পর আরেকটি কারখানা নির্মাণের দায়িত্ব পেয়ে যাই। প্রতিষ্ঠা করেছি ‘ওসাকা’ নামে একটি অ্যালুমিনিয়াম কারখানা। কারখানাটিকে আমার দাঁড় করাতে প্রায় দুই বছর লেগেছে। এরপর নির্মাণ করেছি আভেস্টা নামে আরেকটি কারখানা। এটি নির্মাণ করতে প্রায় দুই বছর সময় লেগেছে।
ক্ষুদ্র শিল্প খাতে কল-কারখানা গড়ে তুলতে যে অভিজ্ঞতা প্রয়োজন তা কলেজ-বিশ্ববিদ্যায়ে পড়ে অর্জন করা যায় না। তাই শিল্প-কারখানা নির্মাণের বাজারে রয়েছে তার ব্যাপক খ্যাতি। আওয়ামী লীগ নেতা, সাবেক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার ইউরো স্টার অ্যালুমিনিয়াম নামে এই ধরনের একটি কারখানা রয়েছে। তার কারখানাটি তৈরির পেছনে রয়েছে অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ান শাহ্ জামাল ভূঁইয়ার অবদান। তিনি এটি নির্মাণ করেছেন ২০১৫ সালে। মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরীর ইউরো স্টার অ্যালুমিনিয়াম ক্ষুদ্র শিল্পের বাজারে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছে।
বিশিষ্ট টেকনিশিয়ান শাহ্ জামাল ভূঁইয়া একের পর এক কারখানা তৈরি করেছেন। তাতে তিনি হাঁপিয়ে যাননি। ২০১৭ সালে তার পরামর্শ ও তত্ত্বাবধানে নির্মিত একটি কারখানার নাম রাকা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। পরে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে নিউ অ্যালুমিনিয়াম।
বর্তমানে শাহ্ জামাল ভূঁইয়া টপ ও লালন শাহ্ নামে আরও দুটি কারখানা নির্মাণের কাজে হাত দিয়েছেন। তিনি যে কয়েকটি কারখানা নির্মাণ করেছেন, সবক’টি ব্যবসা-সফল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তাই তাকে বসে থাকতে হয়নি। সত্যিকার অর্থে এই ধরনের কারখানা নির্মাণের ক্ষেত্রে তিনি একজন সফল টেকনিশিয়ান।
সাফল্য
শাহ্ জামাল ভূঁইয়া বিয়ে করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক কৃষক পরিবারে স্ত্রীর নাম জুলেখা বেগম। তাদের এক ছেলে এবং দুই মেয়ে। ছেলে বড়। নাম জামিল আহমেদ, আহসান উল্লাহ ইউনিভার্সিটি থেকে বিবিএ সম্পন্ন করেছেন। বড় মেয়ের নাম সাদিয়া আক্তার মীম। তিনি ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করছেন- তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। ছোট মেয়ে সুমাইয়া আক্তার গুলশান ভিশন ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের ছাত্রী। পড়াশোনা করছে প্রথম শ্রেণীতে, ইংলিশ ভার্সনে। শাহ জামাল ভূঁইয়া পড়াশোনার ব্যাপারে বেশিদূর অগ্রসর না হলেও ছেলেমেয়েদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলার ব্যাপারে খুবই মনোযোগী। তিনি মনে করেন- প্রকৃত শিক্ষিত লোক কখনো অন্যায় কাজ করতে পারে না। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে মানবিক গুণসম্পন্ন আদর্শ মানুষ গড়ে তোলা। এই প্রসঙ্গে শাহ্ জামাল ভূঁইয়া বলেন, আমি চাই আমার সন্তানেরা সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে উঠুক। নিজেদের জীবন ও জীবিকার পাশাপাশি মানবকল্যাণে কাজ করুক। তাদের ব্রত হোক মানবসেবা।
শাহ্ জামাল ভূঁইয়া ব্যবসায়িকভাবে যেমন সফল, তেমনই পারিবারিকভাবেও সুখী জীবনের অধিকারী। অভিজ্ঞ এই টেকনিশিয়ান ২০১৮ সালে ‘শাহ্ ভূঁইয়া ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড’ নামে একটি ক্ষুদ্র শিল্পের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। এ ধরনের শিল্পগুলো হচ্ছে বাংলাদেশের সূচনাপর্বের উদ্যোগ। বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে জিনজিরায় এর যাত্রা শুরু। ধোলাই খালের পারে এর পূর্ণ বিকাশ। ক্ষুদ্র শিল্পগুলো হচ্ছে এদেশের মানুষের সহজাত প্রতিভার উদাহরণ। একসময় খুচরা যন্ত্রাংশের জন্য নির্ভর করতে হতো বিদেশের ওপর। এরপর এদেশের টেকনিশিয়ানদের মেধায় ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ উৎপাদন এবং ছোট ছোট কারখানা স্থাপনে দেশ এখাতে স্বয়ংসম্পূর্ণ’ হয়ে উঠেছে। আগে অ্যালুমিনিয়ামের কাঠামোগুলো বিদেশ থেকে আমদানি করা হতো। বর্তমানে এসব কাঠামো বাংলাদেশেই তৈরি হয়। শাহ্ জামাল ভূঁইয়া এই শিল্পের বিকাশে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালে নিজেই প্রতিষ্ঠা করেছেন শাহ্ ভূঁইয়া ইঞ্জিনিয়ারিং নামে একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান। তার এই কারখানা গাজীপুরের মাওনার সিঙ্গার দিঘী এলাকায় অবস্থিত। তিনি এই কারখানায় উৎপাদন করবেন বিভিন্ন ধরনের অ্যালুমিনিয়াম প্রোফাইল। শাহ্ জামাল ভূঁইয়া বলেন বর্তমানে দেশে অ্যালুমিনিয়াম প্রোফাইলের চাহিদা ১০ হাজার মেট্রিক টন। সেখানে দেশে উৎপাদন হচ্ছে চার থেকে পাঁচ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ অ্যালুমিনিয়াম প্রোফাইল উৎপাদনে বাংলাদেশ এখনো স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠেনি। আমদানি-বিকল্প পণ্য হিসেবে অ্যালুমিনিয়াম প্রোফাইল উৎপাদন কারখানা খুবই সম্ভাবনাময়। তাই আমি এই কারখানা নির্মাণে উদ্যোগ নিয়েছি।
তিনি আরো বলেন, ঢাকা মহানগরের পাশে নির্মিত হচ্ছে পূর্বাচল উপশহর। পদ্মা সেতুর দুই পাশেও আধুনিক নগরী গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। এ কারণে ভবিষ্যতে অ্যালুমিনিয়াম প্রোফাইলের চাহিদা বাড়বে।
সম্ভাবনার নব দিগন্ত
বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত রাষ্ট্র থেকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হয়েছে। ফলে জিডিপির আকার বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে দেশজ উৎপাদনের শিল্প খাতের অবদান। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে শিল্প খাতের অবদান ছিল ৩৫ শতাংশ। অর্থাৎ অর্থনৈতিকভাবে কৃষিখাতের চেয়েও শিল্পখাতের আকার অনেক বড়। চারটি বৃহৎ শিল্প খাতের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে শিল্প খাত। এই চারটি খাত হচ্ছে খনিজ ও খনন, ম্যানুফ্যাকচারিং, বিদ্যুৎ, গ্যাস এবং পানি। এগুলোর মধ্যে ম্যানুফ্যাকচারিং খাত সবচেয়ে বড়। বড় শিল্পের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানাগুলোর ভূমিকাও তাৎপর্যপূর্ণ। এই খাতে আত্মকর্মসংস্থানে যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। টেকনিশিয়ান শাহ্ জামাল ভূঁইয়াও আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে একজন সফল ব্যবসায়ী হয়েছেন। এই খাতের শ্রমিকেরা খুব অল্প বয়সে কর্মজীবনে প্রবেশ করে। শাহ্ জামাল ভূঁইয়াও অল্প বয়সে এই পেশায় যুক্ত হয়েছেন করেছেন। ৩০ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তিনি নিজের কারখানা নিজেই প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই সম্পর্কে শাহ্ জামাল ভূঁইয়া বলেন, ছোট থেকেই আমার স্বপ্ন ছিল আমি একটি কারখানার মালিক হবো। আমার সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। এই জন্য আমাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। জীবনে কারোরই ধারাবাহিকভাবে সাফল্য আসে না। বাধা-বিপত্তি আসবেই। আমিও বিভিন্ন সময় বাধার মুখে পড়েছি। কিন্তু হাল ছাড়িনি। আমার প্রতিজ্ঞা ছিল অটুট। এজন্যই বর্তমান পর্যায়ে আসতে পেরেছি। তিনি আরো বলেন, আমার ইচ্ছা কারখানা আরও বড় করার। ইনশাআল্লাহ আমি তা পারবো। শাহ্ জামাল ভূঁইয়া একজন ব্যস্ত উদ্যোক্তা। এর মধ্যেও স্ত্রী-সন্তানদের কথা ভোলেন না। তাদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা মনে রাখেন। সকলকে সুখে রাখার চেষ্টা করেন। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, অসুখী মানুষ জীবনে উন্নতি করতে পারে না।
শিল্পোদ্যোক্তা শাহ্ জামাল ভূঁইয়া বলেন, ক্ষুদ্র শিল্প-কারখানাগুলো রয়ে গেছে সরকারের দৃষ্টির বাইরে। সরকার বড় আকারের শিল্প-কারখানার প্রতি নজর দেয়। কিন্তু এই দিকে নজর দেয়নি। তবে এ ব্যাপারে সরকারের ভালো নীতিমালা রয়েছে। সরকারের উদ্দেশ্য সৎ। কিন্তু ক্ষুদ্রশিল্পের মালিকদের ব্যাংকের দ্বারে গিয়ে থমকে যেতে হয়। বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে বহুমালিক পথে বসে গিয়েছেন। তাদের জন্য স্বল্প সুদে এবং সহজ শর্তে ঋণ পাবার সুযোগ করে দিলে ভালো হয়। ক্ষুদ্রশিল্পগুলোতে চলতি মূলধনের সংকট প্রবল। সরকারের উচিত এর একটা সুরাহা করা। এতে ক্ষুদ্রশিল্পের মালিকদের অবস্থার যেমন উন্নতি হবে, তেমনি দেশের উন্নয়নে তারা অধিকতর ভূমিকা রাখতে পারবেন। বোরহান উদ্দিন


