প্রতিবেদন

গ্লোবাল বিজনেস সামিট দুবাই ২০২১ বাংলাদেশের উন্নয়নের নতুন মাইলফলক

ফেরদৌস সালাম

বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্রস্থল দুবাইতে আগামী ২৫-২৬ মে অনুষ্ঠিত হচ্ছে দ্বিতীয় গ্লোবাল সামিট-২০২১। এই ধরনের একটি বিজনেস সামিট বাংলাদেশের শিল্প-বাণিজ্য ও অর্থনীতির জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে বাংলাদেশ স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর দ্বারপ্রান্তে। একই সাথে এ বছরটি বিশ্বের অন্যতম জাতীয়তাবাদী নেতা হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এদেশের মানুষের মাঝে আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জনের যে বীজ বপন করেছিলেন, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ তা ডালপালায় বিস্তৃত হয়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন- সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এ জন্য প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছে তিরিশ লক্ষাধিক মানুষকে। দু’ লক্ষাধিক মা-বোনকে হারাতে হয়েছে সম্ভ্রম। অনেক এবং দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীন পতাকা বিশ্বের মানচিত্রে সগৌরবে উড্ডীন। কিন্তু তা সত্তে ও শুধুমাত্র অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকার কারণেই আমরা আমাদের কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা ও মুক্তির অর্জন থেকে পিছিয়ে আছি। এ রাষ্ট্রের প্রতিটি মানুষ চায় দেশের উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন। এই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পূরণে শুধু বাংলাদেশে অবস্থানকারী বাংলাদেশিরাই নন- বিদেশে অবস্থানকারী উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী এবং শিল্পপতি যারা ‘এনআরবি’ হিসেবে খ্যাত তারাও বিভিন্ন উন্নয়ন উদ্যোগ গ্রহণ করছেন।


বলা হয়, বাংলাদেশ অমিত সম্ভাবনার দেশ। কিন্তু সেই অমিত সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে প্রথমেই প্রয়োজন পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নের আর্থিক সামর্থ্য। বাংলাদেশ অনেক চমৎকার পরিকল্পনা করতে পারে- কিন্তু তা বাস্তবায়নের আর্থিক সামর্থ্য গড়ে ওঠেনি। বর্তমান সরকার ক’বছর আগে দেশে ১০০টি ইপিজেড প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে এবং তার কাজও দ্রুত গতিতে শেষ হচ্ছে। কথা হচ্ছে- এইসব ইপিজেড বা অর্থনৈতিক জোন গড়লেই না, সেগুলোতে শিল্প-বাণিজ্যের প্রাণের সঞ্চার ঘটাতে হবে। এজন্য দরকার ব্যাপক বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগের উৎস খুঁজতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে এর জন্য প্রয়োজন প্রচুর বৈদেশিক বিনিয়োগ। ঠিক সে সময়টিতেই দেখা গেল বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ১ কোটি ২০ লক্ষাধিক বাংলাদেশি চাকরি ও ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন। তাদের পাঠানো রেমিটেন্স হচ্ছে বাংলাদেশের বাজেট ও জিডিপির অন্যতম প্রধান উৎস। তাদের পাঠানো অর্থ দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হচ্ছে। দেশে ২০২০ সালে রেমিটেন্স খাতে ১ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ এসেছে। বর্তমানে দেশে রিজার্ভের পরিমাণ ৪১ বিলিয়ন ইউএস ডলারেরও বেশি। এটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য আশার আলোকবর্তিকা। জিডিপির হিসাবে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৪৪তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। কিন্তু এ কথাও ঠিক, উপার্জনের জন্য সবাইকে বিদেশে যাওয়া যাবে না। দেশের শিল্প-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্যও চাঙ্গা রাখতে হবে। নতুন নতুন শিল্পায়ন করতে হবে। দেশকে শিল্পায়িতভাবে সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিতে হবে। এই লক্ষ্য নিয়েই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানকারী বাংলাদেশি উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ী যারা দেশকে গভীরভাবে ভালোবাসেন- যারা দেশের উন্নয়ন প্রত্যাশা করেন এবং ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার স্বপ্ন দেখেন- তারা উদ্যোগ নিয়েছেন দুবাইতে ‘দ্বিতীয় গেøাবাল সামিট ২০২১’ আয়োজনের। বিশেষ করে এনআরবি সিআইপিগণ এর অন্যতম উদ্যোক্তা। বর্তমান বাংলাদেশ সরকার বিদেশে অবস্থানকারী ভালো উদ্যোক্তাদের ‘সিআইপি’ সম্মানে ভূষিত করেছে। এই এনআরবি সিআইপিরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাংগঠনিকভাবে একতাবদ্ধ হয়েছেন। তারা চিন্তা-ভাবনা করছেন কীভাবে বাংলাদেশে অধিক বিনিয়োগ করা যায়- কীভাবে বিদেশি বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করা যায়।
বিষয়টি এমন যে দেশে যেমন সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অর্থাৎ এনজিও কিংবা এমএফআইরা দেশকে উন্নতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে- তেমনই বিদেশে অবস্থানরত এনআরবিগণও ঠিক এ ধরনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। তাদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিতব্য ‘ গ্লোবাল বিজনেস সামিট দুবাই-২০২১’ নিয়ে ইতিমধ্যে বাংলাদেশি উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীতো বটেই প্রবাসী উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সাজ সাজ রব পড়েছে। এবারের সামিটের মূল বিষয় হচ্ছে- Connect Your Business.
বিদেশের বাংলাদেশিদের সম্পর্কে এদেশের এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ মালয়েশিয়ার মানুষদের মধ্যে একটা ধারণা রয়েছে যে, বাংলাদেশ মানেই কায়িক পরিশ্রমী- দরিদ্র শ্রমিক। যারা শ্রম বিক্রি করতে বিদেশে পাড়ি জমায়। কথাটি অনেকটা ঠিক হলেও এ দেশেরও যে এক বিশাল উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ী শ্রেণি বিদেশের মাটিতে সাফল্যের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা এবং শিল্প স্থাপন করে বাংলাদেশের উজ্জ্বল ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন তা অনেকেই জানেন না। এদেশের প্রকৌশলী, চিকিৎসক, শিক্ষাবিদ, চিন্তাবিদ, আইনজীবী যে আমেরিকা, ব্রিটেন, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, কানাডাসহ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে শীর্ষ পর্যায়ের স্থান দখল করে আছেন, তাদেরও কেউ কেউ যে সেসব দেশের উল্লেখযোগ্য ‘বিজনেস ম্যাগনেট’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন তাও অনেকের জানা নেই। শুধু তাই নয়, আমেরিকা ও ব্রিটেনের মতো দেশের রাজনীতিতে বাংলাদেশি বাঙালিরা হাউজ অব কমন্সের মেম্বার ও সিনেট সদস্যসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে অবতীর্ণ হয়েছেন- বাংলাদেশকে অনন্য এক উঁচুতে নিয়ে গেছেন সে খবরইবা ক’জন রাখেন!


এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি ম্যাগাজিন ‘বিজনেস আমেরিকা’ ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে এবং এই ধারা অব্যাহত রেখেছে। এই ম্যাগাজিনে শত শত বাংলাদেশি বাঙালির নানা উদ্যোগ ও ব্যবসার চালচিত্র উঠে এসেছে। জাপান, হংকং, সিংগাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, মধ্যপ্রাচ্যের সংযুক্ত আরব আমিরাত, দুবাই, বাহরাইন, কাতার, সৌদি আরব, ওমান, কুয়েতসহ অনেক দেশে বাংলাদেশি উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীরা ব্যবসা ক্ষেত্রে প্রভ‚ত সাফল্য অর্জন করেছেন। এ ছাড়া আমেরিকা, কানাডা, ব্রিটেন, ফ্রান্সসহ ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত অনেক দেশেই খ্যাতিমান তারকা ব্যবসায়ী হিসেবে কেউ কেউ রীতিমতো বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছেন। এসকল উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীর অনেকেই বাংলাদেশে এনআরবি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বিভিন্ন শিল্পায়নে অংশ নিয়েছেন। অনেকেই পাঁচতারকা হোটেলসহ শিল্পখাতে বিনিয়োগ করেছেন কোটি কোটি ডলার। এছাড়া তারা শিক্ষার বিস্তারসহ সেবামূলক কার্যক্রমেও অবদান রেখে চলেছেন। তারা চান বাংলাদেশ উন্নত দেশের কাতারে উঠে আসুক। এটি তাদের হৃদয় থেকে চাওয়া। কারণ, প্রতিটি মানুষই তার শেকড়কে গভীরভাবে আটকে রাখতে চায়। চায় তার পরিচিতিকে উজ্জ্বল করে তুলতে। একসময় যে মানুষটি দারিদ্র্যকে সাথে নিয়ে বিদেশে গিয়েছিল, কিংবা ভাগ্যের সন্ধানে আমেরিকায় গিয়ে অডজব করতে বাধ্য হয়েছে সেই মানুষটি এখন সফল উদ্যোক্তা ব্যবসায়ী কিংবা সেখানকার রাজনীতির মূলধারায় অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছেন। তিনি চান তার জন্মভূমি বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে। এছাড়া বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন কাঠামো দেখেও বিশ্ববাসী অবাক। যখন পদ্মা সেতুর মতো বিশাল স্থাপনা দেখছে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র দেখছে- তারা বিস্মিত হচ্ছে।
স্বাভাবিকভাবে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যকার জাতীয়তাবাদী চেতনার আলোকেই ‘দ্বিতীয় Global Business Summit DUBAI- 2021’ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এতে শুধু প্রবাসী বাংলাদেশি উদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ীরাই নন- বাংলাদেশেরও অনেক উদ্যোক্তা অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছেন। প্রত্যেকেরই স্বপ্ন- উন্নত বাংলাদেশ।
আজকের ভারত দু’দশক আগেও শিল্পে অনেক পিছিয়ে ছিল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রবাসী ভারতীয় তথা ‘নন রেসিডেন্ট ইন্ডিয়ানরা (NRI)’ নিজেরা এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ভারতে বিনিয়োগে আগ্রহী করতে অনেক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন- তার সুফল এখন ভারতের অর্থনীতি পাচ্ছে। বাংলাদেশের যে সকল এনআরবি (নন রেসিডেন্ট বাংলাদেশি) দেশকে এগিয়ে নেওয়ার একটি যোগসূত্র সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়েছেন নিঃসন্দেহে তারা দেশপ্রেমিক। তাদের মধ্যে দেশপ্রেম উজ্জীবিত হয়েছে বলেই তারা এই উদ্যোগ নিয়েছেন। এ ধরনের একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় বিশ্বের অন্যরাও বাংলাদেশের শিল্প-পণ্য সম্পর্কে জানা ও পর্যবেক্ষণের সুযোগ পাবে। তারা জানতে পারবে- এ দেশে কোন কোন খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা বিদ্যমান। একই সাথে বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীরাও পারস্পরিকভাবে একে অপরের সাথে পরিচিত হবার সুযোগ পাবেন। তারা নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক বন্ধন তৈরিরও সুযোগ পাবেন। এভাবেই বাংলাদেশ উন্নয়নের দিকে যাবার অপার সুযোগ খুঁজে পাবে। এনআরবি সিআইপিদের এই উদ্যোগ বাংলাদেশের গতিশীল উন্নয়ন এবং দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর করার ক্ষেত্রে মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে- একথা নিশ্চিত করে বলা যায়।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button