দেশের উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখছেন প্রবাসী উদ্যোক্তারা। যোগাযোগ এবং প্রযুক্তির কল্যাণে পৃথিবী ছোট হয়ে এসেছে এ কথা যেমন সত্যি, তেমনই এটিও সত্যি যে, বিশ্বব্যাপী বিস্তৃতি ঘটেছে বাংলাদেশের। বিশ্বের যেখানেই বাংলাদেশিরা অবস্থান করছেন, সেখানেই রয়েছে বাংলাদেশের উপস্থিতি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ১ কোটি ২০ লাখের বেশি বাংলাদেশি মানেই নিম্নমান কর্মসম্পৃক্ত শ্রমিক; কিন্তু বাস্তবে এটি সত্য নয়। বিশ্বের উন্নত দেশ বিশেষ করে আমেরিকা, কানাডা, ব্রিটেন, জাপান, হংকং, সিঙ্গাপুরসহ ইউরোপিয়ান দেশসমূহে অসংখ্য বাংলাদেশি সেখানকার মূলধারার ব্যবসা-বাণিজ্য ও উন্নত মানের অফিসিয়াল কাজের সাথে সম্পৃক্ত। এদের মধ্যে আবার অনেকে রাজনীতির সাথেও জড়িত। বিশেষ করে আমেরিকা এবং ব্রিটেনের মূলধারার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে উঠে আসার সুযোগ পেয়েছেন কেউ কেউ।
আমেরিকা, ব্রিটেন, কানাডা ও জাপানের উদ্যোক্তা ব্যবসায়ীরা সে সব দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। অনেক উদ্যোক্তাই ‘সেকেন্ড হোম’ এর সুযোগ গ্রহণ করে সেসব দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তৃতি ঘটিয়েছেন। মূলত বাংলাদেশের অনেক প্রবাসীই এখন বিশ্ব নাগরিক। তাদের মধ্যে প্রথম প্রজন্ম যারা বাংলাদেশ থেকে এসব দেশে গিয়ে স্থায়ী হয়েছেন স্বদেশের সাথে তাদের শেকড় সান্নিধ্য যতটা নিবিড়, দ্বিতীয় প্রজন্ম যাদের জন্ম প্রবাসেই, দেশের প্রতি তাদের টান তত গভীর নয়। এ জন্যে প্রবাসের দেশে দেশে বাংলাদেশ কমিউনিটির নেতৃস্থানীয়রা সন্তানদের বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশি কালচার সম্পর্কে জানার সুযোগ সৃষ্টি করেছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশের জাতীয় দিবস-সমূহ বিশেষ করে মাতৃভাষা দিবস, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস ও পহেলা বৈশাখসহ ধর্মীয় অনুষ্ঠান- যেমন ঈদ পুনর্মিলনী ইত্যাদি পালন করা হয়। নিজেদের মধ্যে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতারও আয়োজন করা হয়ে থাকে। এভাবেই প্রবাসে অবস্থানকারী বাংলাদেশিরা নিজ নিজ এলাকায় একখÐ ‘বাংলাদেশ’ গড়ে তুলেছেন যার মাধ্যমে বাংলাদেশের কৃষ্টি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে বিশ্ববাসীও জানার সুযোগ পাচ্ছে এবং বাংলাদেশকে সমীহ করছে।
বিশ্বের অনেক দেশেই বাংলাদেশি বংশোদ্ভ‚ত প্রবাসীরা স্বাস্থ্য, প্রযুক্তিগত ও শিক্ষা বিষয়ে শীর্ষ পর্যায়ে উঠে এসেছেন। চিকিৎসক, প্রকৌশলী এবং শিক্ষাবিদ হিসেবেও সুনাম ও স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের এই স্বীকৃতি ও প্রতিষ্ঠা লাভে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়েছে।
প্রবাসের সফল উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের দেশের মাটিতে কাজে লাগানোর লক্ষ্যেই বর্তমান সরকার এনআরবিদের দেশে ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি করে। এর ফলে প্রবাসীদের উদ্যোগে দেশে তিনটি এনআরবি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এ ছাড়া অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি উদ্যোক্তা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পে বিনিয়োগ করেছেন এবং এই প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।
এটি নি:সন্দেহে আনন্দের বিষয় যে, এদেশের কৃতী ও গর্বিত সন্তানরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিজেদের মেধা, যোগ্যতা ও প্রচেষ্টা দ্বারা শুধু নিজেদের ভাগ্যই বদলাচ্ছেন তাই নয়, বাংলাদেশের অর্থনীতিকেও বদলে দিয়েছেন। প্রবাসে থাকলেও তাদের দেশপ্রেম গভীর। তারা দেশকে নিয়ে ভাবেন, দেশের উন্নয়ন প্রত্যাশা করেন। এ জন্যে তারা শুধু রেমিট্যান্সই প্রেরণ করেন না, দেশে বিনিয়োগ করতেও আগ্রহী। এ জন্যে তারা উপযুক্ত বিনিয়োগ পরিবেশ আশা করেন। তারা চান গুড গভর্ন্যান্স। চান আইন ও বিচারিক শাসন। একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, বিশ্বব্যাপী আর্থিক মন্দা এবং বর্তমান করোনাকালীন আর্থিক মন্দার জের বাংলাদেশকে সেভাবে পোহাতে হয়নি- একমাত্র বৈদেশিক রেমিট্যান্স ফ্লো স্বাভাবিক থাকায়।
স্বাভাবিকভাবেই বলা যায়, প্রবাসী উদ্যোক্তা ব্যবসায়ীসহ অন্য পেশাজীবীদের অবশ্যই যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে। তাদের উপযুক্ত মর্যাদা ও সম্মান দিতে হবে। যোগাতে হবে উৎসাহ-উদ্দীপনা। আমাদের বিশ্বাস, এভাবেই বাংলাদেশের অর্থনীতির মূলধারায় প্রবাসীদের সম্পৃক্ত করার মধ্য দিয়ে দেশকে সমৃদ্ধশালী করা সম্ভব হবে।



