২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীন থেকে ছড়ানো করোনাভাইরাসের কারণে প্রায় সব দেশেই ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দাভাব দেখা দেয়। পণ্যের উৎপাদন ও বিক্রি যেমন কম হয়েছে, তেমনি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোও হিমশিম খেয়েছে গ্রাহককে সন্তুষ্ট করতে। স্বাভাবিকভাবেই এর প্রভাব পড়েছে ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধিতে। ব্যতিক্রম ঘটেনি বাংলাদেশের পারিবারিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও।

তবে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় দেশের পারিবারিক কোম্পানিগুলোর সার্বিক পরিস্থিতি অবশ্য মিশ্র। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইতিবাচক প্রভাবও লক্ষ্য করা গেছে।
সম্প্রতি যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিশ্বখ্যাত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্রাইসওয়াটারহাউসকুপারস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড (পিডবিøউসি) প্রকাশিত এক জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে। দু’ বছর পরপর এই জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করে পিডবিøউসি। এতে এবার দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের মতামত নেয়া হয়।
গত বছরের ৫ অক্টোবর থেকে ১১ ডিসেম্বরের মধ্যে পরিচালিত ‘বৈশ্বিক পারিবারিক ব্যবসায় জরিপ ২০২১’ শীর্ষক এই জরিপে বিশ্বের ৮৭টি অঞ্চলের দুই হাজার ৮০১ জন ব্যবসায়ী অংশ নেন। এর মধ্যে বাংলাদেশের ছিলেন ৫৪ জন।
এছাড়া ইউরোপের ১০৭৪ জন, মধ্যপ্রাচ্যের ৭৩ জন, আফ্রিকার ২৩১ জন, উত্তর আমেরিকার ২০৫ জন এবং লাতিন আমেরিকার ৪১৩ জন অংশ নেন।
বিশ্বব্যাপী মহামারি শুরুর আগের বছরে (২০১৮ সাল) বাংলাদেশের ১৫ শতাংশ কোম্পানির দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি হয়েছে, আর ৩৭ শতাংশের হয়েছে এক অঙ্কের প্রবৃদ্ধি। এই সময়ে বিশ্বের ২১ শতাংশ কোম্পানি দুই অঙ্ক এবং ৩৩ শতাংশ কোম্পানি এক অঙ্কের প্রবৃদ্ধির দেখা পেয়েছে।
মহামারি হানা দেয়ার পর ৬৩ শতাংশ বাংলাদেশি পারিবারিক কোম্পানির মুনাফা কমেছে, যা বৈশ্বিক পর্যায়ে ৫১ শতাংশ। অথচ দুই বছর আগেও দেশের পারিবারিক ব্যবসার প্রবৃদ্ধি বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে অনেক ভালো অবস্থানে ছিল। ২০১৮ সালে বিশ্বব্যাপী পারিবারিক ব্যবসার ক্ষেত্রে গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩৪ শতাংশ, আর বাংলাদেশের ছিল ৫৩ শতাংশ।
আগামী দুই বছরে বাংলাদেশের পারিবারিক কোম্পানিগুলোকে কয়েকটি বিষয়ে আরও গুরুত্বারোপের পরামর্শ দিয়েছে পিডবিøউসি।
সেগুলো হলো- ডিজিটাল সক্ষমতার উন্নয়ন, নতুন বাজার সম্প্রসারণ, নতুন গ্রাহক অনুসন্ধান, বাজারে নতুন পণ্য বা সেবা নিয়ে আসা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং সবশেষে ব্যবসার সুরক্ষা খরচের দিকে খেয়াল রাখা।
৭৪ শতাংশ বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ২০২১ সালে ভালো প্রবৃদ্ধি হবে বলে আশা করেন। একই রকম চিন্তা করেন বিশ্বের ৬৫ শতাংশ ব্যবসায়ী। ২০২২ সালে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা আরও বেশি। বছরটিতে ৯৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির আশা করছেন তারা। বৈশ্বিক ক্ষেত্রে যা ৮৬ শতাংশ।
পরবর্তী প্রজন্মের মালিকানা গ্রহণের হার
পিডবিøউসি বলছে, বর্তমানে ৫৭ শতাংশ পারিবারিক ব্যবসা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে হস্তান্তরিত হচ্ছে। বৈশ্বিক পর্যায়ে যা ৫৫ শতাংশ। তবে দেশের ৫২ শতাংশ ব্যবসায়ী চান, তাদের ব্যবসার নিয়ন্ত্রণভার পরিবারের সদস্যদের হাতেই থাকুক।
জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে পারিবারিক ব্যবসায়ের বেশিরভাগ শেয়ারের মালিকানা প্রথম প্রজন্মের (ব্যবসার প্রতিষ্ঠাতা) হাতে রয়েছে এমন কোম্পানির সংখ্যা শতকরা ২৮ ভাগ। তবে আগামী পাঁচ বছরে এটি কমে শতকরা ১৭ ভাগে নেমে আসতে পারে।
সেখানে আরও বলা হয়, পারিবারিক ব্যবসার বেশিরভাগ শেয়ার দ্বিতীয় প্রজন্মের হাতে আছে ৫০ শতাংশ কোম্পানির। পাঁচ বছর পর এটি কমে ৪৮ শতাংশে নামবে।
বর্তমানে তৃতীয় প্রজন্মের হাতে আছে ১৫ শতাংশ কোম্পানি। জরিপ অনুযায়ী যা পাঁচ বছর পরে ২০ শতাংশে উন্নীত হবে।
বর্তমান সময়ে চতুর্থ প্রজন্মের হাতে আছে ৭ শতাংশ কোম্পানি। পাঁচ বছর পরে যা ১৫ শতাংশে উন্নীত হবে। বাংলাদেশের ৪১ শতাংশ পারিবারিক কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে (বোর্ড অব ডিরেক্টরস) রয়েছে পরবর্তী প্রজন্ম। বিশ্বে যার পরিমাণ ৩০ শতাংশ।
জরিপে অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের ৮০ শতাংশই পারিবারিক ব্যবসাকে গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করেন।
ব্যবসা পরিচালনায় সুশাসন
ব্যবসা পরিচালনায় স্বচ্ছ নিয়মনীতি ও দায়িত্বশীলতা রয়েছে ৬৩ শতাংশ বাংলাদেশি কোম্পানির। যা বিশ্বে ৭৪ শতাংশ। শক্তিশালী ব্যবসায়িক নেতৃত্ব রয়েছে ৬৫ শতাংশ বাংলাদেশি কোম্পানির। যা বিশ্বে ৭১ শতাংশ। স্বচ্ছ সুশাসন কাঠামো রয়েছে ৪৩ শতাংশ বাংলাদেশি কোম্পানির। বিশ্বে যার হার ৬৫ শতাংশ।
ডিজিটাল সক্ষমতা
জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশের ৩৯ শতাংশ কোম্পানির শক্তিশালী ডিজিটাল সক্ষমতা রয়েছে। যা বিশ্বে ৩৮ শতাংশ।
তবে, ডিজিটাল সক্ষমতা সম্পর্কে নিজেদের শক্ত অবস্থানের কথা জানিয়েছেন মাত্র ৭ শতাংশ বাংলাদেশি ব্যবসায়ী। এমন কথা জানিয়েছেন বিশ্বের ১৯ শতাংশ ব্যবসায়ী। আর ১৯ শতাংশ বাংলাদেশি ব্যবসায়ী জানান, শক্ত না হলেও বিষয়টিতে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন তারা। বৈশ্বিক বিবেচনায় এ ধরনের অবস্থানের কথা জানান ৩৩ শতাংশ ব্যবসায়ী।
৪৩ শতাংশ বাংলাদেশি এক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিতেই রাজি নন। বিশ্বে এই হার ২৯ শতাংশ।
সামাজিক দায়বদ্ধতা
করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) কার্যক্রমের আওতায় স্থানীয়ভাবে অনুদান দেয়ার ক্ষেত্রে বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় এগিয়ে বাংলাদেশ। ৮৩ শতাংশ বাংলাদেশি কোম্পানি স্থানীয়ভাবে অনুদান প্রদান করে থাকে। যা বিশ্বে ৭৪ শতাংশ।
এ বিষয়ে পিডব্লিউসির বৈশ্বিক পারিবারিক ব্যবসার নেতা পিটার ইংলিক্স বলেছেন, বিশ্বব্যাপী পারিবারিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আশানুরূপ পরিবর্তন আসছে না। এতে প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক ঝুঁকি বাড়ছে। ডিজিটাল সক্ষমতার ক্ষেত্রে দ্রুততম সময়ে অনেক কাজ করতে হবে প্রতিষ্ঠানগুলোকে।
অর্থকণ্ঠ ডেস্ক


