জাতীয় পার্টি, বিএনপিসহ বিরোধীদলীয় সদস্যদের বিরোধিতা সত্তে¡ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেট পাস হয়েছে। জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে ‘নির্দিষ্টকরণ (সম্পূরক) বিল-২০১৯’ পাসের মাধ্যমে এই সম্পূরক বাজেট পাস হয়। এই বাজেট পাসের মধ্য দিয়ে সংসদ ৩৭টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে অতিরিক্ত ১৫ হাজার ১৬৬ কোটি ১৮ লাখ ৫৪ হাজার টাকা ব্যয় করার অনুমতি দিয়েছে। এর মধ্যে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়কে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে সম্পূরক বাজেটের অর্থ অনুমোদনের জন্য ৫৮টি মঞ্জুরি দাবি উত্থাপন করা হয়।
সম্পূরক বাজেটের আওতায় ৩৭টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে সর্বাধিক দুই হাজার ৪৪৭ কোটি ৮৮ লাখ ২৩ হাজার টাকা নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়কে বরাদ্দের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এরপরই রয়েছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। এ খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এক হাজার ৬০৪ কোটি ৬৪ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। এছাড়া এক হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ পাওয়া অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে রয়েছে- স্থানীয় সরকার বিভাগ খাতে এক হাজার ৫৪২ কোটি ৮৪ লাখ ৫৯ হাজার টাকা, বিদ্যুৎ বিভাগ এক হাজার ২৭৬ কোটি ৭৯ লাখ ৪৪ হাজার টাকা এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এক হাজার ১৮২ কোটি ৯৩ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
সম্পূরক বাজেটে সবচেয়ে কম ৮৩ লাখ ৫৪ হাজার টাকা বরাদ্দ অনুমোদন পেয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ১৭ কোটি ২ লাখ ৯৫ হাজার টাকা, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ৮ কোটি ৭ লাখ ৭৮ হাজার টাকা, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ৩৩ কোটি ৭২ লাখ ৫৭ হাজার টাকা, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ২২৯ কোটি ৬৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা, সরকারি কর্মকমিশন ৪৬ কোটি ৯৩ লাখ ৩৪ হাজার টাকা, মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় দুই কোটি ৬ লাখ ৪৬ হাজার টাকা, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ ৪২৮ কোটি ৪ লাখ ৭ হাজার টাকা, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ ১৪১ কোটি ৮৬ লাখ ৩৭ হাজার টাকা, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১৫১ কোটি ৬৭ লাখ ৩৫ হাজার টাকা, আইন ও বিচার বিভাগ ৫৪ কোটি ১২ লাখ ৬৯ হাজার টাকা, জননিরাপত্তা বিভাগ ৬৭৪ কোটি ৩৩ লাখ ৪৭ হাজার টাকা, লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ দুই কোটি ৮৮ লাখ ৩৪ হাজার টাকা, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ ৯৭২ কোটি ৫ লাখ ৮৭ হাজার টাকা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ১৯০ কোটি ৫০ লাখ টাকা, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ৪৪ কোটি ৬ লাখ ২৫ হাজার টাকা, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ১১৫ কোটি ৯৩ লাখ ১৮ হাজার টাকা, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ৩২৬ কোটি ৫৮ লাখ ৪৬ হাজার টাকা, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় ২১ কোটি ৮ লাখ ১৭ হাজার টাকা, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ ৫৭ কোটি ৫৬ লাখ ১৫ হাজার টাকা, শিল্প মন্ত্রণালয় ২২০ কোটি ৯৭ লাখ ৭৭ হাজার টাকা, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় ৮৭৬ কোটি ১৬ লাখ ১১ হাজার টাকা, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ ৩০৫ কোটি ৪৩ লাখ তিন হাজার টাকা, পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ৬৯ কোটি ৩৭ লাখ ৭ হাজার টাকা, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ৫৮৬ কোটি ৬৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় ৫৯ কোটি ১৩ লাখ ৮৬ হাজার টাকা, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ৬৭৭ কোটি ৭৩ লাখ ৯৩ হাজার টাকা, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ৫১ কোটি ৫৯ লাখ ৭৭ হাজার টাকা, দুর্নীতি দমন কমিশন ৫ কোটি ৩৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ ৫৫ কোটি ২৯ লাখ ৪৩ হাজার টাকা এবং সুরক্ষা সেবা বিভাগ ৬৭৪ কোটি ৭১ লাখ ৩৪ হাজার টাকা।
সাংবিধানিক নিয়ম অনুসারে যেসব মন্ত্রণালয় বা বিভাগ বাজেটের বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় করতে পারেনি তাদের হ্রাসকৃত বরাদ্দের জন্য সংসদের অনুমতির কোনো প্রয়োজন হয় না। কিন্তু যেসব মন্ত্রণালয় বা বিভাগ অতিরিক্ত ব্যয় করেছে কেবলমাত্র তাদের বরাদ্দই সংসদের অনুমতির প্রয়োজন হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সংসদে এই সম্পূরক বাজেট পাস হয়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জন্য চার লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার বাজেট পাস করা হলেও বছর শেষে কাট-ছাঁটের পর এই বাজেট দাঁড়িয়েছে চার লাখ ৪২ হাজার ৫৪১ কোটি টাকায়।
এদিকে সংসদ অধিবেশনে সম্পূরক বাজেটের ওপর মোট ৫৮টি দাবির উপর ২১৭টি ছাঁটাই প্র্রস্তাব আনা হয়। ছাঁটাই প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নেন জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ, মো. ফখরুল ইমাম, লিয়াকত হোসেন খোকা, পীর ফজলুর রহমান, ডা. রুস্তম আলী ফরাজী ও রওশন আরা মান্নান এবং বিএনপির মো. হারুনুর রশীদ ও গণফোরামের মোকাব্বির খান। তারা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমালোচনার পাশাপাশি সম্পূরক বাজেট বরাদ্দ না দেওয়ার দাবি জানান।
ঘাটতি মেটাতে ৪৭,৩৬৪ কোটি টাকা
ব্যাংক ঋণ নেবে সরকার
২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। ঘাটতি মেটাতে এবার ব্যাংক থেকে ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা ঋণ নিতে চায় সরকার।
১৩ জুন জাতীয় সংসদে নতুন অর্থবছরের জন্য ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার বাজেট পেশ করার সময় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এই তথ্য জানান। প্র্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা এবং ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ১০ হাজার ২৬২ কোটি টাকা। আয়-ব্যয়ের বিশাল পার্থক্যের কারণে এবার বাজেট ঘাটতিও অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
২০১৯-২০ অর্থবছরে অনুদান ছাড়া বাজেট ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। এই ঘাটতি মেটাতে বিদেশ থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে ৬৩ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকার। আর ব্যাংক থেকে সরকার ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা ঋণ নিতে চায়। এ ছাড়া, জাতীয় সঞ্চয়পত্র থেকে নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৭ হাজার কোটি টাকা।
এই প্রথম বাজেট উপস্থাপন করলেন প্রধানমন্ত্রী
টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ সরকারের বর্তমান মেয়াদের প্রথম বাজেট উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল মাঝপথে অসুস্থতা অনুভব করলে বাজেট নিজেই উপস্থাপন শুরু করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশের ইতিহাসে কোনো প্রধানমন্ত্রীর এটাই প্রথম বাজেট উপস্থাপন।
অর্থমন্ত্রী বেশ কয়েকদিন ধরেই অসুস্থ। এরপরও তিনি সংসদে এসে বাজেট উপস্থাপন করছিলেন। কিছুক্ষণ বাজেট উপস্থাপনের পর তিনি অসুস্থতা অনুভব করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাকিটুকু নিজেই উপস্থাপন করতে চান। যদিও তিনি নিজেও গলার ব্যথায় ভুগছেন। তবু অর্থমন্ত্রীর অসুস্থতার কারণে কষ্ট করে হলেও নিজেই বাজেট উপস্থাপন শুরু করেন প্রধানমন্ত্রী।
জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরিন শারমীন চৌধুরীর কাছে প্রধানমন্ত্রী বাজেট উপস্থাপনের অনুমতি চেয়ে বলেন, ‘আমার অর্থমন্ত্রী অসুস্থ। আমি নিজেও গলার সমস্যায় আছি। এরকম কখনো হয়নি। এবার হলো। যাহোক, মাননীয় অর্থমন্ত্রী যতটুকু পড়েছেন, তার পর থেকে আমি শুরু করছি।’ এ সময় স্পিকারকে তিনি বলেন, ‘তিনি বসে বাজেট উপস্থাপন করতে পারবেন কি না।’ স্পিকার তাঁকে বলেন, ‘আপনার যেভাবে সুবিধা, বসেও পড়তে পারেন।’
বাংলাদেশের বাজেটের ইতিহাসে এই প্রথম অর্থমন্ত্রীর অসুস্থতার কারণে প্রধানমন্ত্রী তাঁকে সহায়তা করার জন্য নিজেই বাজেট উপস্থাপন করলেন। বাজেট উপস্থাপনের ইতিহাসে এটি এরকম প্রথম ঘটনা।
২০১৯-২০২০ অর্থবছরের এই বাজেট দেশের ৪৮তম বাজেট। আওয়ামী লীগ সরকারের ১৯তম এবং বর্তমান অর্থমন্ত্রীর প্রথম বাজেট প্র্রস্তাব। ‘সমৃদ্ধ আগামীর পথযাত্রায় বাংলাদেশ : সময় এখন আমাদের, সময় এখন বাংলাদেশের’ শিরোনামে প্র্রস্তাবিত বাজেটে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা।
২০১৮-১৯ অর্থবছরের মূল বাজেট ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। এই অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট ৪ লাখ ৪২ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা। অর্থাৎ নতুন বাজেটের আকার সংশোধিত বাজেট থেকে ৮০ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকার মতো বেশি। নতুন বাজেটে ব্যয় মেটাতে সরকারি অনুদানসহ আয়ের পরিমাণ ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এনবিআর বহির্ভূত করব্যবস্থা থেকে আসবে ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং বিভিন্ন সেবামূলক থেকে ৩৭ হাজার ৭১০ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য ঠিক করে রাখা হয়েছে। বরাবরের মতো নতুন বাজেটের ঘাটতিও থাকছে জিডিপির ৫ শতাংশ। মোট ঘাটতি ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা।
জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৮.২০ শতাংশ
নতুন অর্থবছরে (২০১৯-২০) মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ২০ শতাংশ অর্জন করতে চায় সরকার। ১৩ জুন অর্থমন্ত্রী আ হ ম ম্রুস্তফা কামাল জাতীয় সংসদে ‘সমৃদ্ধির সোপানে বাংলাদেশ, সময় এখন আমাদের’ স্লোগান সংবলিত এই বাজেট পেশ শুরু করেন। এটি অর্থমন্ত্রী হিসেবে তার প্রথম বাজেট। বাজেট ঘোষণার সময় জিডিপির এই লক্ষ্যমাত্রার কথা জানান তিনি।
চলতি অর্থবছর ৭ দশমিক ৮০ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যের বিপরীতে প্রাথমিক হিসাবে অর্জন হয়েছে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। গত দুই বছর ধরেই লক্ষ্যের চাইতে জিডিপিতে বেশি প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে নতুন অর্থবছরে এ লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘চলতি বছর ৭ দশমিক ৮০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। ইতোমধ্যে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। মাঝারি ও বৃহৎ শিল্প সূচক প্রায় ১৪ শতাংশ বেড়েছে। ভর্তুকি, কৃষি উপকরণ সরবরাহ ও অন্যান্য সহায়ক কার্যক্রমে আমন ও বোরোর উৎপাদন বেড়েছে। সব কিছু মিলিয়ে আগামী অর্থবছরও প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হবে।’ টানা তিন বছর ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়। এর মধ্যে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ধরা হয়েছিল ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। নয় মাসের হিসাবে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি অর্জিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তথ্য পর্যালোচনা করে পূর্বাভাস দিয়েছে যে, অর্থবছর শেষে প্রবৃদ্ধির হার বেড়ে দাঁড়াবে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ।
বাজেট অর্থনৈতিক অপশাসনের সুবিধাভোগীদের পক্ষেই গেছে : সিপিডি
অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাবিত বাজেট সচ্ছল উচ্চ আয়ের মানুষকে অনেক বেশি সুবিধা দেবে। মধ্যবিত্ত বিশেষ করে বিকাশমান মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তরা এ বাজেট থেকে খুব বেশি উপকৃত হবে না। এক কথায় বলা যায়, এ বাজেট অর্থনৈতিক অপশাসনের সুবিধাভোগীদের পক্ষেই গেছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট পর্যালোচনায় এমন মন্তব্যই করেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। বাজেটের সামগ্রিক মূল্যায়ন করতে গিয়ে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাজেটের স্বচ্ছতা নিয়ে আমাদের কিছু বক্তব্য আছে। প্রথমত. অর্থমন্ত্রী কর সম্পর্কিত যে তথ্যগুলো ব্যবহার করেছেন, তা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পক্ষ থেকে এসেছে। আমরা বারবার বলেছি, অর্থ মন্ত্রণালয় ও এনবিআরের তথ্যের মধ্যে পার্থক্য আছে। এ পার্থক্যের পরিমাণ ১৯ হাজার কোটি টাকা। যদি এনবিআরের তথ্যটি ব্যবহার করা হয়, তাহলে রাজস্ব আহরণের হার অবশ্যই ভালো দেখা যাবে। মন্ত্রী বিচক্ষণতার সঙ্গে সেটিই ব্যবহার করেছেন।
দ্বিতীয়ত. সরকার যখন বাজেটে কোনো আর্থিক পদক্ষেপ নেয়, নতুন সুবিধা দেয় বা নতুন কর আরোপ করে, তখন তা হয়তো সাংবিধানিক দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। তবে এক্ষেত্রে মোট কত ছাড় দিলেন ও কাকে ছাড় দিলেন, তা বলতে হবে। মোট কত কর আরোপ করলেন, কোন গোষ্ঠীর ওপর আরোপ করলেন, এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা না থাকলে বাজেট স্বচ্ছ হলো না। এ স্বচ্ছতা আমরা পাই না। কিবরিয়া সাহেব আর সাইফুর রহমান সাহেব যখন ছিলেন, তখন এ স্বচ্ছতা পাওয়া যেত। নতুন অর্থমন্ত্রীকে এ স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনার জন্য অনুরোধ করব।
বাজেট বক্তৃতায় উপস্থাপন করা তথ্য ও প্রতিবেদনের মধ্যে কিছু সামঞ্জস্যহীনতা রয়েছে বলেও দাবি করেছে সিপিডি। উদাহরণ দিয়ে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, যেমন- উৎসে কর কাটার স্তর হিসেবে বক্তৃতায় আছে ২৫ লাখ টাকা, অন্যদিকে এনবিআর যে হিসাব দিয়েছে তাতে উল্লেখ আছে ১৫ লাখ টাকা। এগুলো নিয়ে বিভ্রান্তি আছে। আমরা বলতে চাই তথ্য-উপাত্তের নিশ্চয়তা নিরূপণ করেন, সামঞ্জস্য আনেন, আরো স্বচ্ছতা নিয়ে আসেন। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, আমরা কিছু কাঠামোগত সংস্কারের কথা বারবার বলে আসছি, যেমন ব্যাংকিং কমিশন। কিন্তু এটিকে একটি আলোচনার বিষয় বানিয়ে দেয়া হয়েছে, কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। কোনো সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাই স্বীকার করা হলো না বাজেটে। আর্থিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ২০১৩ সাল থেকে সরকারের কার্যক্রমের যে শ্লথগতি আমরা দেখেছি, তার বড় কারণ হলো আমাদের যে বার্ষিক কর্মসূচি, রাজস্ব কর্মসূচি, ভুক্তি ব্যবস্থাপনা, পাইকারি খুচরা মূল্যের সেবা-পরিষেবার যে দাম এগুলোর কোনোটিই সংস্কারের ক্ষেত্রে যায়নি। পরিতাপের বিষয় এবারো সেই সংস্কার থেকে আমরা বঞ্চিত হলাম।
সংস্থাটির মতে, এ মুহূর্তে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের যে চিন্তা, তার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, কিন্তু বাংলাদেশের গরিব মানুষের শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যে সক্ষমতা তা তুলনামূলক বাড়ছে না। এমনকি ব্যক্তি বিনিয়োগও বাড়ছে না। এর ফলে আমাদের সামাজিক সক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। আয়-বৈষম্য বাড়ছে, ধন-বৈষম্য বাড়ছে, এমনকি ভোগের বৈষম্যও বাড়ছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে বৈষম্য প্রকট হচ্ছে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ড. দেবপ্রিয় বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলার জন্য আপনি এগোচ্ছেন। কিন্তু যে সমাজে বৈষম্য বৃদ্ধি পায়, সেই সমাজ টেকে না, আজ হোক কাল এটি ভেঙে পড়বে। যেভাবে বাংলাদেশে বৈষম্য বাড়ছে এর ফলে ৭, ৮, ৯, ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি টেকানো কষ্টকর হবে। এটা অর্থনৈতিক তত্তে¡র ঐতিহাসিক সত্য। বাংলাদেশের এ বাজেটের পুরো রাজস্ব পদক্ষেপ দেখে বলা যায়, এটা সচ্ছল উচ্চ আয়ের মানুষকে অনেক বেশি সুবিধা দিচ্ছে। আর গরিব মানুষের জন্য প্রান্তিক একটা ব্যবস্থা থাকছে। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত বিশেষ করে বিকাশমান মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত এ বাজেট থেকে খুব বেশি উপকৃত হবে না।
যুগোপযোগী ও জনকল্যাণমূলক
বাজেট : আওয়ামী লীগ
২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটকে স্বাগত জানিয়েছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, আওয়ামী লীগ মনে করে, এবারের বাজেট জনকল্যাণমুখী, বাস্তবসম্মত ও ভারসাম্যমূলক। যুগোপযোগী এ বাজেট প্রণয়নের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ। বাজেট নিয়ে দলের পক্ষে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, প্র্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়ন সবসময়ই চ্যালেঞ্জিং। শেখ হাসিনার নতুন সরকার নতুন উদ্যম নিয়ে বাজেট বাস্তবায়নের এ চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করবে। বাজেটে কোনো নেতিবাচক দিক রয়েছে কিনা, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের উত্তরে ওবায়দুল কাদের বলেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে এ বাজেট অনন্যসাধারণ দলিল। বাজেটে কোথাও নেতিবাচক কোনো বিষয় নেই। এটা জনবান্ধব বাজেট। যারা বাজেট নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন, তাদের বেলায় এ লাইনটি প্রযোজ্য ‘যারে দেখতে নারি, তার চলন বাঁকা।’ মূলত তারা আওয়ামীবিদ্বেষ থেকে বাজেট নিয়ে মনগড়া বিরূপ মন্তব্য ও বিদ্বেষমূলক কথা বলছেন। তৃতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম বাজেটকে ‘উচ্চাভিলাষী’ অভিহিত করে বিএনপি বলেছে, জনগণের বিরুদ্ধে এ বাজেট দেওয়া হয়েছে। এতে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য বাড়বে; জনপ্রত্যাশা পূরণ হবে না। বিএনপির এমন অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, ১০ বছর ধরে প্রতিটি বাজেট সম্পর্কে বিএনপি এ ধরনের মনোভাবই প্রকাশ করেছে। কিন্তু প্রত্যেকটা বাজেটই দেশকে নানা সোপান অতিক্রম করে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়ার দিকে নিয়ে গেছে। কাজেই তাদের এসব বিরূপ সমালোচনা মনগড়া ও গতানুগতিক। বিএনপি ১০ বছর ধরে বাজেট সম্পর্কে যে মনোভাব প্রকাশ করেছে, ঠিক একই মন্তব্য এবারো করেছে। এবারো এর কোনো ব্যতিক্রম আমরা লক্ষ করিনি। অবশ্য বিএনপি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় মাত্র ৫০ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রণয়ন করেছিল। তাদের পক্ষে জনগণের কল্যাণের লক্ষ্যে শেখ হাসিনা সরকারের দেয়া ৫ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকার বাজেটের ব্যাপকতা অনুধাবন করা সম্ভব নয়। এটাই স্বাভাবিক। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিফলন এবারের বাজেটে ঘটেছে বলেও মন্তব্য করেছেন দলটির সাধারণ সম্পাদক।
বাজেট থেকে জনগণ করের
বোঝা পেয়েছে : বিএনপি
বর্তমান সরকারের ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট থেকে জনগণ করের বোঝা পেয়েছে বলে দাবি করেছে বিএনপি। বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে দলের পক্ষ থেকে বাজেট প্রতিক্রিয়ায় এ দাবি করেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। মির্জা ফখরুল বলেন, দেশের অর্থনীতির ব্যবস্থাপনা একটি শ্রেণির কাছে জিম্মি হয়ে রয়েছে। অনির্বাচিত সরকারের নৈতিক অধিকার নেই বাজেট দেয়ার। সরকার জনগণকে বাইরে রেখে যেভাবে নির্বাচন করেছে, একইভাবে বাজেটও দিচ্ছে। যেভাবে জনগণ এ নির্বাচন গ্রহণ করেনি, তেমনি বাজেটও তারা গ্রহণ করবে না। মির্জা ফখরুল পুনরায় বলেন, জনগণ বাজেট গ্রহণ করেনি। মির্জা ফখরুল তার লিখিত বক্তব্যে বলেন, বাজেটের পরিকল্পনা, বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া, খাতভিত্তিক বরাদ্দ ও সমস্যা নির্ধারণ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি হচ্ছে। অনুৎপাদনশীল খাতে খরচ অত্যধিক। প্রতি বছরই বাজেটে বিপুল পরিমাণ ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। ঘাটতি মেটাতে ঋণের পরিমাণও বাড়ছে। বাজেট বাস্তবায়নের হারেও দেখা যায় নিম্নমুখিতা। বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির হয়ে আছে। দেশের অর্থনীতি কিছুসংখ্যক মানুষের কাছে জিম্মি হয়ে গেছে দাবি করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, যাদের কাছে অর্থনীতি জিম্মি, তারাই বাজেট প্রণয়ন করছে। তারা অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে। আবার তারাই সরকার পরিচালনা করছে। মির্জা ফখরুল বলেন, জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার উচ্চাভিলাষী বাজেট ঘোষণা করেছেন। বাজেটের আকার বড় করার চমক সৃষ্টির প্রতিযোগিতায় নেমেছেন যেন অর্থমন্ত্রী। কিন্তু বাজেট বৃদ্ধির এ প্রগলভতা বছর শেষে চুপসে যেতে দেখা যায়। বাজেটের আকার কত বড়, এ নিয়ে আর জনমনে কোনো উচ্ছ¡াস নেই। কেননা প্রতি বছরের শেষ দিকে সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ যেভাবে কাটছাঁট করা হয়, তাতে বিরাটাকার বাজেটের অন্তঃসারশূন্যতাই প্রকাশ পায়।
ঘাটতি অর্থায়নে ব্যাংক নয়, বিকল্প উৎস
খুঁজতে হবে : এফবিসিসিআই
২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট ‘ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব’ বলে মন্তব্য করেছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই)। তবে ঘাটতি অর্থায়নে স্থানীয় ব্যাংকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প উৎস সন্ধানের অনুরোধ জানিয়েছে সংগঠনটি। বাজেট নিয়ে এফবিসিসিআইয়ের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে সংগঠনটির নেতারা। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত প্রতিক্রিয়া পাঠ করেন এফবিসিসিআই সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম। এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, এবারের প্র্রস্তাবিত বাজেট ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব। তবে কোনো ধরনের সংশোধন প্রয়োজন হলে সেটা আলোচনার মাধ্যমে করা হবে। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ক্ষুদ্র ও ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে একটা সেকশন পর্যন্ত রাজস্ব লক্ষ্যের আওতার বাইরে রাখার প্রস্তাব দিয়েছিল এফবিসিসিআই। এক্ষেত্রে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভারকে ভ্যাটের বাইরে রাখা এবং ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত টার্নওভারের কারখানার ক্ষেত্রে ভ্যাট ৩ শতাংশ করার প্র্রস্তাব দিয়েছিলাম। যখনই আমরা আলোচনা করেছি, তখন সরকার আমাদের প্রস্তাবনা অনুযায়ী উপকরণ প্রচলন ও ব্যাংকিং খাতে পুনর্গঠনমূলক যে কাজ চলছে, তা অল্প সময়ের মধ্যে সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করি। এছাড়া বড় ধরনের আইনি কাঠামো তো আছেই। সবকিছু বিবেচনায় আমরা মনে করি, সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এ বাজেট হয়েছে। করপোরেট করহার প্রসঙ্গে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, করপোরেট কর কমলে নিশ্চিতভাবেই ব্যয় কমবে, সম্পদ সৃষ্টি হবে, পুনর্বিনিয়োগ হবে। তবে এসব নিয়ে বৈজ্ঞানিকভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
নতুন ভ্যাটে ভোক্তা চাপ বাড়বে কিনা, এমন প্রশ্নের উত্তরে ফজলে ফাহিম বলেন, কিছু পণ্যের বিষয়ে (যেমন রড) আমাদের আলোচনা ছিল ভ্যাট হারটা সর্বনিম্ন রাখা হবে। এতে টনপ্রতি ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়ার কথা। সেক্ষেত্রে আলোচনা করে পদক্ষেপ নেব। ১ হাজার ও ৫০০ টাকা দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতি হবে বলে আমাদের মনে হয় না। লক্ষ্য রাখতে হবে যেসব ফ্রেমওয়ার্কে পরিবর্তন আসছে বাজারে, তা প্রতিফলিত হয় কিনা। সে লক্ষ্যেই আমাদের ওয়ার্কিং কমিটি তৈরি করা হয়েছে। এ গ্রুপ ফ্রেমওয়ার্কে পরিবর্তনের ফলে কোনো অব্যবস্থাপনা হয় কিনা, সে বিষয়ে লক্ষ্য রাখবে।
কালো টাকা সাদা করার সুযোগ প্রসঙ্গে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, বাংলাদেশ ২০২১ সালে মধ্যম আয়ের দেশে যাবে। এখন ইনফরমাল ইকোনমিকে ফরমাল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এটা সামনের দিকে এগোনোর জন্য অন্যতম হাতিয়ার। আমরা যে প্রস্তাবনা পেয়েছি, সেখানে কালো টাকা বলা হয়নি, অপ্রদর্শিত অর্থ বলা হয়েছে। বৈধ উপায়ে আয় করা কোনো টাকা যদি প্রদর্শন করা না হয় সেক্ষেত্রে ওই টাকা উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছে। এ কারণে আমরা এটাকে স্বাগত জানাই। কারণ এটা বৈধ উৎস থেকে আয় করা, যেকোনো কারণেই হোক আপনি তা প্রদর্শন করেননি। আর এ টাকা যদি উৎপাদনশীল খাতে যায়, কর্মসংস্থান হয়, তাহলে আমরা মনে করি না সেটা নেতিবাচক কিছু।
পোশাক খাতে ১ শতাংশ উৎসে করহার প্রসঙ্গে এফবিসিসিআই সহসভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, পোশাক খাতে ১ শতাংশ হারে ছিল ও আছে। আলোচনা করে এটা কখনো দশমিক ৫, সর্বশেষ দশমিক ২৫ করা হয়। এখন গেজেট অনুযায়ী দীর্ঘদিন ধরে ১ শতাংশ হারেই আছে। সেজন্য কখনো সেটা পরিবর্তন করা হয় না। পরিবর্তন করা হলে সংসদে আলোচনা ও খাতসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে এ বিষয়ে আপনাদের জানানো হবে। তিনি বলেন, আমরা বাজেটকে ব্যবসাবান্ধব বলার মূল কারণ হলো, খাতসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে সরকার এটা দিয়েছে। সেজন্যই আমরা বাজেটকে ব্যবসাবান্ধব বলছি। এর পরও যদি কোনো আলোচনার কিছু থাকে, আমরা ঠিক করে নেব।
সিঙ্গেল ডিজিট সুদহার বাস্তবায়নের
তাগিদ ডিসিসিআইর
ব্যাংকঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নিয়ে আসার প্র্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (ডিসিসিআই)। এ প্র্রস্তাবকে দ্রুত বাস্তবায়ন করার আহ্বান জানায় সংগঠনটি। ডিসিসিআই থেকে পাঠানো প্রতিক্রিয়ায় এ কথা জানানো হয়। ডিসিসিআই সভাপতি ওসামা তাসীর বলেন, এ ধরনের বড় বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা বৃদ্ধি, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং দক্ষতা উন্নয়ন একান্ত অপরিহার্য। বিগত অর্থবছরের তুলনায় এত বড় রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা চ্যালেঞ্জিং। নতুন বাজেটে সামগ্রিক ঘাটতি থাকছে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। ঘাটতি বাজেট পূরণে ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে অর্থায়ন করা হবে, যা সহনশীল বলে মনে করছে ডিসিসিআই। তবে এজন্য বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ যেন কমে না যায়, সেদিকেও সরকারের খেয়াল রাখতে হবে। আর্থিক সংস্কার বিগত অর্থবছর বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ছিল ১২ দশমিক ৫ শতাংশ, যদিও মুদ্রানীতি অনুযায়ী বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে খেলাপি ঋণ ১ লাখ ১০ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা। দেশের খেলাপি ঋণের ৪৮ শতাংশ সরকারি ব্যাংক খাতের। এছাড়া প্রস্তাবিত বাজেটে ‘ইনসলভেন্সি অ্যান্ড ব্যাংকরাপ্সি ল’ শিরোনামে একটি আইন প্রণয়নের প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছে ঢাকা চেম্বার। ব্যাংকিং খাতে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যাংকিং কমিশন গঠন, মার্জার ও অ্যাকুইজিশনের উদ্যোগকে স্বাগত জানাচ্ছে। বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়ন ও করপোরেট করহার হ্রাস না করা হলে সরকারের প্রত্যাশিত বেসরকারি বিনিয়োগ ও উৎপাদনমুখী খাতে বিনিয়োগ বাড়বে না। আর বিনিয়োগ না বাড়লে বাজেটে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়বে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ২ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব বলে মনে করেন ওসামা তাসীর। বিশেষত বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অধীনে ৬৪টি জেলায় ওয়ান স্টপ সার্ভিস বাস্তবায়ন এবং এখানে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের জন্য স্টার্টআপ ফান্ড গঠন করার সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানান তিনি।
পোশাক খাতে ৩% নগদ প্রণোদনা দাবি বিজিএমইএর
দেশের তৈরি পোশাক শিল্প চার দশক পার করলেও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এখনো শিশু বলে মনে করেন এ শিল্পের মালিক-প্রতিনিধিরা। দুর্বল এ শিল্পের জন্য রফতানিতে কমপক্ষে ৩ শতাংশ নগদ প্রণোদনা ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন তারা। ২০১৯-২০ প্র্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণার আগে ৫ শতাংশ হারে নগদ প্রণোদনা চেয়েছিল বিজিএমইএ। কিন্তু ১৩ জুন সংসদে উপস্থাপিত প্র্রস্তাবিত বাজেটে এ শিল্পের জন্য ১ শতাংশ নগদ প্রণোদনা ঘোষণা করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এ ব্যাপারে বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক বলেন, আমাদের এ দেশটিতে একটা প্রবণতা আছে- সাধারণকে গুরুত্ব দেয়া হয়, মেধাতন্ত্র সবসময় মার খায়। আমরা এত কষ্ট করে উদ্যোক্তা তৈরি করি, কর্মসংস্থান করি কিন্তু প্রতিনিয়ত আমাদের শুনতে হয়- আমরা পরিপক্ব, আমাদের আর সাহায্য-সহযোগিতার দরকার নেই। এটা খুবই কষ্টকর।
রুবানা হক বলেন, এ শিল্প কি আসলেই পরিপক্ব? প্রবৃদ্ধি দুই অঙ্কের হলে সেই শিল্পকে দ্রæত বর্ধনশীল বলা যায়। কিন্তু গত ১০ বছরে আমাদের গড় প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৭০ শতাংশ। তারপর যদি নতুন উদ্ভাবন না থাকে, সেই শিল্প ধসে যায়। গত দেড় মাসে ৩০টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। ঈদের সময় খুব কষ্ট হয়েছে আমাদের প্রতিটি কারখানাকে ডেকে ডেকে বুঝিয়ে, অনেক কিছু করে শেষ পর্যন্ত বেতন-বোনাস দিয়ে শ্রমিককে বাড়ি পাঠাতে হয়েছে। অনেক কারখানা মেশিন বিক্রি করে হলেও শ্রমিককে টাকা দিয়েছে। কাজেই সারাক্ষণ বললে হবে না যে এ পরিপক্ব শিল্পের প্রণোদনা দরকার নেই।
এ সময় জিডিপিতে কৃষি ও পোশাক খাতের অবদানের তুলনা ধরেন রুবানা হক। তিনি জানান, জিডিপিতে ১৩ দশমিক ৬০ শতাংশ অবদান কৃষির, সেখানে প্রণোদনা দেয়া হয়েছে ৯ হাজার কোটি টাকা। আর পোশাক শিল্পের অবদান ১৬ শতাংশ, অথচ এ খাতে প্রণোদনা দেয়া হয়েছে ২ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত বিজিএমইএর অন্য দাবিগুলোর মধ্যে একটি হলো টাকার অবমূল্যায়ন। সংগঠনটির দাবি মোট রফতানি আয়ের ওপর ডলারপ্রতি ১ টাকা অবমূল্যায়ন হলে পোশাক খাত বছরে প্রায় ৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা পায়। এছাড়া ব্যাংকঋণের সুদের হার এক অংকের কোটায় আনার সিদ্ধান্ত কার্যকরের সুনির্দিষ্ট ঘোষণা আশা করে বিজিএমইএ।
পুঁজিবাজারে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের
সুযোগ চায় দুই স্টক এক্সচেঞ্জ
নির্ধারিত হারে কর দিয়ে পুঁজিবাজারে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ চেয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই)। আগামী ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্র্রস্তাবিত বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে দুই স্টক এক্সচেঞ্জের পক্ষ থেকে এ দাবি জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে বাজেট প্রতিক্রিয়ায় সিএসই ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. গোলাম ফারুক জানান, ঘোষিত বাজেটে করজালের আওতা বাড়ানো, হুন্ডির পরিবর্তে বৈধ পথে প্রবাসী আয় প্রেরণে প্রণোদনা ও চার স্তরবিশিষ্ট নতুন মূল্য সংযোজন কর বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণের কথা উলেখ রয়েছে। অন্যদিকে শিক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ানো, স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের জন্য বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রমের ওপর জোর দেয়া হয়েছে, যা পুঁজিবাজারের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমরা আশা করছি। গত ২ এপ্রিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে বাজেটে বিবেচনার জন্য আটটি প্র্রস্তাবনা উপস্থাপন করে সিএসই। এর মধ্যে শুধু করমুক্ত লভ্যাংশের সীমা বাড়ানোর প্র্রস্তাবটি আংশিক বিবেচনা করা হয়েছে। তাই এক্সচেঞ্জটির বাজেট প্র্রস্তাবনাগুলো পুনর্বিবেচনার জন্য অর্থমন্ত্রীকে অনুরোধ জানিয়েছে সিএসই।
তাছাড়া প্র্রস্তাবিত বাজেটে রুগ্ন কোম্পানিকে ভালো কোম্পানি কর্তৃক অধিগ্রহণের সুযোগ রাখা, নগদ লভ্যাংশের পরিবর্তে বোনাস লভ্যাংশের ওপর ১৫ শতাংশ হারে করারোপ, রিটেইনড আর্নিংস বা রিজার্ভ যদি পরিশোধিত মূলধনের ৫০ শতাংশের বেশি হয়, তবে বাড়তি রিজার্ভের ওপর ১৫ শতাংশ হারে করারোপসহ বিনিয়োগ উৎসাহিত করার জন্য লভ্যাংশ আয়ের ওপর দ্বৈত কর তুলে নেয়ার প্র্রস্তাব করা হয়েছে। এসব প্র্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে সিএসই বলছে, এতে বাজারে একটি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সংবাদ সম্মেলনে ডিএসইর পক্ষ থেকে বাজেটে পুঁজিবাজারসংক্রান্ত প্রণোদনাসহ আর্থিক খাতের সংস্কারে যেসব উদ্যোগ নেয়ার কথা বলা হয়েছে, সেগুলোকে স্বাগত জানানো হয়েছে। এর পাশাপাশি আরো বেশ কিছু বিষয় বিবেচনার জন্য ডিএসইর পক্ষ থেকে দাবি জানানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্টক এক্সচেঞ্জকে ডিমিউচুয়ালাইজেশন-পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য পূর্ণ কর অব্যাহতি সুবিধা প্রদান করা, এসএমই প্লাটফর্মে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজ লেনদেনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ উৎসে কর অব্যাহতি প্রদান করা, স্টক এক্সচেঞ্জের ট্রেডিং প্লাটফর্মের মাধ্যমে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের লেনদেনের ওপর কর অব্যাহতির বিষয়টি সুস্পষ্টকরণ, তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে করপোরেট আয়কর হারের পার্থক্য ১০ শতাংশের পরিবর্তে ২০ শতাংশে উন্নীত করা, সার্বিক বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় স্টক এক্সচেঞ্জের ট্রেকহোল্ডার কর্তৃক সিকিউরিটিজ লেনদেনের পর উৎসে কর দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে দশমিক শূন্য ১৫ শতাংশ নির্ধারণের পাশাপাশি এ আয়কর কর্তনকে করদাতার চূড়ান্ত কর দায় হিসেবে বিবেচনা করার দাবি জানিয়েছে সিএসই।
অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে বিষয়টি নিয়ে কমিটি গঠন করার কথা জানিয়েছিল। বলা হয়েছিল, সুনির্দিষ্ট যেসব ইস্যু আমাদের জন্য উদ্বেগের কারণ হবে, সেগুলো তার সঙ্গে আলোচনা করে সমাধান করতে পারব।


