বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিচারণ করে এম আর আখতার মুকুল এর লেখা ‘মুজিবের রক্ত লাল’ (সাগর পাবলিশার্স, ২০০০) বইতে একটি নিদারুণ প্রসঙ্গ উল্লিখিত হয়েছে। ১৯৭২-এ স্বাধীন দেশে ফিরে আসেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। দেশ গঠনে আত্মনিয়োগ করেন। অন্যদিকে পরাজিত শক্তি নানাভাবে মুজিব হত্যার কিংবা তাঁর সরকারের পতন ঘটানোর জন্য বিভিন্ন পাঁয়তারা শুরু করে। কমবেশি সবাই জানত, আর এখন তা প্রমাণিত। প্রমাণ দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু নিজের জীবন দিয়ে, পরিবারের সবাইকে বাংলার জন্য চরম মূল্য দিতে হয়েছে। ১৯৭৩ সালে এমন একটি প্রসঙ্গের আলাপচারিতায় শেখ মুজিবুর রহমান লেখক এম আর আখতার মুকুলকে বলেছিলেন, ‘আমাকে মারতে চাস, মার। তোরা কোনদিন শান্তি পাবি না।’

আমরা জানি বঙ্গবন্ধু ভবিষ্যৎদ্রষ্টা ছিলেন না। তবুও তিনি এদেশের মানুষের মনের ভাব আগ্রহ হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করতে পারতেন। তাই ইতিহাসে দেখা যায়, তিনি দলের সর্বাত্মক সমর্থন না পেয়েও ছয় দফার পরিকল্পনা থেকে পিছু হটেননি। আন্দোলন করে জনগণকে সাথে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়ে যেমন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন, তেমনি সফলতা সম্পর্কে ছিলেন পুরোপুরি আশাবাদী। সেই বঙ্গবন্ধু যখন তাঁর বিরুদ্ধে নানারকম ষড়যন্ত্র দুরভিসন্ধি দেশি-বিদেশি চক্রান্তের খবর প্রতিনিয়ত শুনছিলেন, সেই অবস্থায় তাঁর এই উক্তি, আক্ষেপ নাকি অভিশাপ ?
যাই হোক ওই যে তিনি বলেছিলেন- তোরা কোনদিন শান্তি পাবি না। তাঁর অভাবনীয়, অবিশ্বাস্য নির্মম মৃত্যুর পর আদতেই কি আমরা শান্তি পেয়েছিলাম? এখনো কি আমরা শান্তির সন্ধান করছি না? তিনি বলেছিলেন, ‘আমাকে মারতে চাস, মার’। মৃত্যুভয় তাঁর কখনো ছিল না। যদি থাকতো তাহলে একাত্তরে পাকিস্তানে বন্দি অবস্থায় যখন তাঁর সামনে কবর খুঁড়ে বলা হয় ওই কবরে, ওই গর্তে তাঁকে কবর দেয়া হবে। তিনি বিন্দুমাত্র বিচলিত বোধ করেননি। উল্টো অসীম সাহসী বীরের মতো বলেছেন, ‘এক মুজিব মারা গেলে লক্ষ মুজিবের জন্ম হবে’।
দেশের জন্য স্বপ্ন, জনগণের কল্যাণের জন্য আকাক্সক্ষা, পরিকল্পনা, সর্বোপরি দেশপ্রেম না থাকতো শুধু সুবিধার জন্য, ব্যক্তিগত লাভালাভের জন্য রাজনীতি করতেন, তাহলে ঠিকই তিনি ইয়াহিয়া খান কিংবা জুলফিকার আলী ভুট্টো অথবা ভারত সরকারের সঙ্গে এক ধরনের বোঝাপড়া করতেন। ইতিহাস সাক্ষী তিনি ভেঙে পড়েননি, ব্যক্তিস্বার্থে কোনো আপস-মীমাংসা করেননি। যার ফলাফল আমরা দেখি তিনি দেশে ফিরে এসেই ভারতীয় সহযোদ্ধা সৈনিক, যারা মুক্তিসংগ্রামে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করেছে, তাদেরকে অতি অল্প সময়ের মধ্যে ভারতে ফেরত পাঠাবার ব্যবস্থা করেছেন। পাকিস্তানের সঙ্গে শুধুমাত্র আটকে পড়া বাংলাদেশি সেনা সদস্যসহ সাধারণ মানুষকে নিরাপদে স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার স্বার্থে যুদ্ধবন্দিদের ফেরত দিতে সম্মত হয়েছিলেন।

তাছাড়াও তিনি ওই চুক্তিতে স্পষ্টভাবে একটি ধারা সংযুক্ত করেছিলেন, যাতে করে পাকিস্তানি সৈন্যদের যুদ্ধাপরাধ, মানবিক অপরাধ ও গণহত্যাজনিত অপরাধের বিচার করা হয়। পাকিস্তান সরকার চুক্তির শর্ত মেনে নিলেও, শর্ত পালন করেনি। আর বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সেই চুক্তির শর্ত পালন করার প্রশ্নই আসে না। অবশ্যই বঙ্গবন্ধু জীবিত থাকলে তাদের দেশে না হলেও আন্তর্জাতিক আদালতে সেই যুদ্ধাপরাধীদের, গণহত্যাকারীদের বিচারের ব্যবস্থা করতেন।
১৯৭১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় হিস্যা যা পাকিস্তানের কাছে পাওনা তা আজও পর্যন্ত আদায় করা সম্ভব হয়নি। কোনোরকমে মাঝেমধ্যে সেই দাবি মিনমিন করে কোনো কোনো ফোরামে উত্থাপিত হলেও জোরালোভাবে তা আদায়ের কোনো চেষ্টা আমরা দেখি না।
বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তাঁর এই জন্মশতবর্ষে নানা রকম আয়োজন উদ্যোগে চোখধাঁধানো মনভোলানো প্রাণজুড়ানো মুখ ঘোরানো অবস্থা দেখা যায়। শতবর্ষ পালনের সময় অতিক্রান্ত হলে- সেই ধারা, সেই আগ্রহ কতটুকু তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারবে, সে ব্যাপারে সন্দেহ থেকেই যায়। কারণ দীর্ঘ দুই যুগ পর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব দেওয়া দল, স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া দল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে। তাও দশকের বেশি কাল গত হয়েছে। এখনো পর্যন্ত আমরা দেখি আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে নানা দলছুট বা দলীয় ব্যক্তি আওয়ামী লীগার সেজে, দলের অভ্যন্তরে কিংবা তাদের আচরণ দিয়ে দলের সুনাম, ভাবম‚র্তি নষ্ট করছে। দলীয় নেতৃত্ব তার দায় না নিয়ে তারস্বরে চিৎকার করে বলছেন- ওরা গোপনে দলের অভ্যন্তরে ঢুকেছে। ওরা হাইব্রিড, ওরা কারা- ওরা আওয়ামী লীগের কেউ নয়। বেশ ভালো কথা। ওরা আওয়ামী লীগের কেউ না হলে দলীয় পরিচয়ে এতদিন এই দোর্দণ্ড প্রতাপ দেখিয়ে দলের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করল। তা কেউ দেখল না, কেউ জানলো না? বলা হয় এরা নিম্ন স্তরের নেতা-কর্মীদের মাধ্যমে দলে অনুপ্রবেশ করেছে। সেই নিম্ন স্তরের নেতা-কর্মীদের তত্ত্বাবধান করার জন্য উপরের স্তরের কোনো নেতার দায় নেই? তাহলে পার্টি শৃঙ্খলা কিভাবে ব্যবস্থপনা কিংবা পরিচালনা করা হয়? এ সব প্রশ্নের সদুত্তর পাওয়া খুব কঠিন। দলীয় ব্যবস্থপনায় ত্রুটি আছে বলেই বর্ণচোরা লোকজন দলীয় ক্ষতির কারণ হয়ে ক্যাসিনো কান্ড, বালিশ কান্ড, পর্দা কান্ড, মাস্ক কান্ড, টেন্ডার লাভ কান্ড, আরও জানা অজানা নানান রকম কান্ড ঘটিয়ে চলেছে।
নিকট অতীতে অতিমারির সময় আমরা দেখছি দলীয় লোকজন জনসেবায় নয় ব্যবসা-বাণিজ্যের গলিঘুঁজি দিয়ে, জনগণের স্বাস্থ নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। সরকারি প্রশাসন যারা দায়িত্বপূর্ণ পদে আছেন জনগণের সেবা নিশ্চিত করার জন্য, তাদেরকে দেখি দায়-দায়িত্ব না নিয়ে দায়সারাভাবে চাকরির সময়টুকু পার করছে। দেখতে পাই এই আমলাগণ সরকারকে নানা যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে যা আমরা সাধারণ মানুষ বুঝতে অক্ষম, সরকারি কোষাগার থেকে বিবিধ সুবিধা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করেছেন আমরণ, আজীবন কালের জন্য। হয়ত আমরা ভবিষ্যতে দেখব তারা মৃত্যুর পরেও সরকারি সুবিধা ভোগ করতে থাকবেন।
বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবিতকালে খুব অল্প সময় পেয়েছিলেন দেশ পরিচালনার জন্য। যুদ্ধবিধ্বস্ত, কোষাগারশূন্য একটি রাষ্ট্রকে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার সব রকম কৌশল তিনি প্রয়োগ করে সার্থক হয়েছিলেন। সার্থকতা তাঁর মৃত্যুর কাল হয়েছিল। তিনি দেশের উন্নয়নের জন্য, পুনর্গঠনের জন্য নির্ভর করেছিলেন আমলা শ্রেণীর উপরে। হয়তো বুঝতে পারেননি যে যুবক, যে কিশোর, যে কৃষক সন্তান, যে ছাত্র জীবনে কোনোদিন বন্দুক রাইফেল দেখেনি, গ্রেনেড-বোমা চোখে দেখেনি, এমনকি বন্দুক থেকে ছোড়া গুলির শব্দ শোনেনি, সেই তারাই যখন খালি গায়ে, খালি পায়ে, খালি পেটে, সামান্য কয়েক দিনের প্রশিক্ষণ নিয়ে, দেশপ্রেমের শক্তিতে বলবান হয়ে- সুশিক্ষিত একটি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করতে পারে, তাদেরকেই দেশ গঠনের কাজে লাগানো দরকার, আমলাদের নয়। যারা স্বাধীনতার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত পাকিস্তানের তাঁবেদারি করেছে। তাহলে বোধকরি আজকে দেশ যেখানে এসে দাঁড়িয়েছে, বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে, তা আরো কয়েক দশক আগে সম্ভব হতো।
তাহলে হয়তো বঙ্গবন্ধুর অকাল মৃত্যু হতো না। কেননা যে আমলাদের তিনি বিশ্বাস করে, বাংলাদেশি মনে করে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন, তাদের অধিকাংশই যথাযথ সততার সঙ্গে সেই দায়িত্ব পালন করেননি। এসব নিয়ে তিনি দুঃখ করেছেন, উষ্মা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু, কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বঙ্গবন্ধুর অতি আত্মবিশ্বাস ছিল সবাই তার মতো দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ। যেহেতু এখন এটি বাংলাদেশ, পাকিস্তান নয়, পাকিস্তানিরা নেই, এই দেশ এখন আমাদের সকলের নিজের দেশ। আমরা এই দেশকে সোনার বাংলারূপে গড়ে তুলবো। এই বিশ্বাস সবাই করে, এমন একটি সাধারণ ধারণা বঙ্গবন্ধুর মধ্যে ছিল বলেই বোধ হয়।
বঙ্গবন্ধুকে বারবার সাবধান করে দেয়ার পরেও তিনি বিশ্বাস করেননি, মেনে নেননি যে, এদেশের কেউ তাঁকে হত্যা করতে পারে! তিনি জানতেন তাঁর দলের লোকদের মধ্যে কেউ কেউ সুযোগ পেলে তাঁর ক্ষতি করবে, দেশের ক্ষতি করবে, সেজন্য তিনি সেই সমস্ত লোকজনকে তাঁর কাছাকাছি রাখার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু, তাঁর এই কৌশল ব্যর্থ হয়েছে। আমরা আজও পর্যন্ত পরিষ্কারভাবে জানি না স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সরকারের অন্যতম চার নেতা কেন বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন! অথবা তিনি কেন তাঁদের অবিশ্বস্ত মনে করছিলেন কিংবা কেউ তাঁকে ভুল বুঝিয়েছিল কিনা যে এরা বঙ্গবন্ধুর দেশ গঠনে যে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দরকার তাতে বাধ সাধবে। জানি না বঙ্গবন্ধু সন্দেহ করেছিলেন কিনা তাঁর পরিকল্পনামতো তাঁকে তারা এগোতে দেবেন না।
যুদ্ধকালীন সরকারের নেতৃত্ব দিয়ে তাঁদের এক ধরনের বিশেষ ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছিল যা বঙ্গবন্ধুর জন্য প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করতে পারে বলে কানভারি করা হয়েছিল, তাও পরিষ্কার জানা যায় না। আমরা এসব কিছুই জানি না। কেউ এই বিষয়ে পরিষ্কার করে কোথাও কিছু লিখেছেন বলেও জানা যায় না। সবকিছু বাদ দিয়ে আমরা শুধু এই আশাই করবো- বঙ্গবন্ধু যেন হয় চর্চার বিষয়। বঙ্গবন্ধু যেন শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমিত হয়ে না থাকেন। সরকারি অফিসগুলোতে আমলাদের উদ্যোগে ‘বঙ্গবন্ধু কর্নার’ বলে একটা অংশ সাজানো হয়েছে, সেখানে যে সমস্ত বই-পুস্তক রয়েছে, সংগ্রহ করা হয়েছে সেগুলোর মান নিয়ে যেমন প্রশ্ন আছে, তেমনি প্রশ্ন করা যায় আদৌ কি সেসব ব্যবহার করা হবে কিংবা বাস্তবিকভাবে সেই কর্নার কি ব্যবহার উপযোগী? অফিস চলাকালীন সময়ে সেই বঙ্গবন্ধু কর্নার অব্যবহৃত থাকবে। হয়তো ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সেখানে দেখবে সরকার বদল হলে সেই সমস্ত কর্নার, বই-পুস্তক কোথায় হারিয়ে যাবে!
আমরা জেনেছি এম আর আখতার মুকুলের বর্ণনায় ১৫ আগস্ট লন্ডন হাইকমিশন অফিসে ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছিল। বঙ্গবন্ধু যে রাষ্ট্রদূতকে নিজে নিয়োগ দিয়েছিলেন সেই রাষ্ট্রদূত চোখের পলকে নিজের রূপ বদলে ফেলেছিলেন। উ”ছৃংখল একদল মানুষের অনুরোধে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের ক্যামেরায় ছবি তোলার সুবিধা করে দেওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধুর ছবি আবার ভাঙচুর করতে পরিকল্পনামতো তিনি সহায়তা করেছেন, সুযোগ দিয়েছেন। আমরা চাই না নতুন প্রজন্ম ইতিহাসের তেমন পুনরাবৃত্তি আবার দেখুক। আমরা চাইব বঙ্গবন্ধুর জীবনাচরণ, তাঁর দর্শন, তাঁর দেশচেতনা, তাঁর দেশপ্রেম সমস্তই আলোচিত হবে; গবেষকগণ খুঁজে বের করবেন, প্রচার করবেন, প্রকাশ করবেন তবেই জাতি গঠনে, দেশ গঠনে কেবল এগিয়ে যাওয়া অব্যাহত থাকবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চিরঞ্জীব থাকবেন আপন মহিমায়।৩

করীম রেজা : কবি, সাবেক অধ্যক্ষ, কলাম লেখক
এই নিবন্ধের লেখক
করীম রেজা


