সাক্ষাৎকার

পেনসেলভেনিয়ার জনগণকে অর্থনীতি পুলিশি সেবা ও বিচার ব্যবস্থা পুনর্গঠনের আশ্বাস দিয়েছি

ড. নীনা আহমেদ, পিএইচডি অডিটর জেনারেল, পেনসেলভেনিয়া

হওয়ার কথা ছিল চিকিৎসক। ভর্তিও হয়েছিলেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে। কিন্তু উচ্চতর শিক্ষার জন্যে যুক্তরাষ্ট্রের বৃত্তি পাওয়ায় আর দেশে থাকেননি। একুশ বছর বয়সেই চলে আসেন আমেরিকায়। ইউনিভার্সিটি অব পেনসেলভেনিয়ায় ‘রসায়ন’ বিষয়ে পিএইচডি করেন ১৯৯০ সালে। জেফারসন ইউনিভার্সিটি থেকে ফেলোশিপ করেছেন মলিক্যুলার জেনেটিক্স তথা চিকিৎসা বিজ্ঞানে। একজন রিসার্চ সায়েন্টিস্ট হিসেবে ব্যাপক সুনাম কুড়িয়েছেন। তার চেয়েও বেশি সুনাম ও খ্যাতি অর্জন করেছেন আমেরিকার মূলধারার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান এবং একের পর এক নির্বাচনে জয়ী হয়ে। এই কৃতী মানুষটি হলেন বাংলাদেশের ময়মনসিংহের কন্যা ড. নীনা আহমেদ, পিএইচডি।

ড. নীনা আহমেদ সাম্প্রতিক সময়ে আমেরিকার পেনসেলভেনিয়ায় ‘অডিটর জেনারেল’ পদে পাঁচ লাখ ভোটে জিতেছেন। তার এই বিজয় শুধু বাংলাদেশিদেরই নয়, বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষী সকলের। আমেরিকার মূলধারার রাজনীতিতে ইতিহাস সৃষ্টি করে ‘অডিটর জেনারেল’ পদে প্রথম বাংলাদেশি নারীর বিজয় রেকর্ড গড়লেন তিনি। আমেরিকার মূলধারার রাজনীতিতে দীর্ঘ ২৩৩ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম একজন বাংলাদেশি ও অশ্বেতাঙ্গ এই পদে নির্বাচিত হবার সৌভাগ্য পেলেন। এর আগে কখনো শ্বেতাঙ্গ প্রার্থীকে হারানো যায়নি। ডেমোক্রেটিক প্রাইমারির এই ভোট অনুষ্ঠিত হয় ২ জুন। ড. নীনার প্রাপ্ত ভোট প্রায় ৪,৮৫,০০০। প্রধান প্রতিদ্ব›দ্বীর চেয়ে তিনি ৮০ হাজার ভোট বেশি পেয়েছেন।
পেনসেলভেনিয়ার রাজধানী ফিলাডেলফিয়ায় বসবাসকারী ড. নীনা আহমেদ ২০১৪ সালে বারাক ওবামা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। এশিয়া-আমেরিকা বিষয়ক কমিশনের উপদেষ্টা ছিলেন তিনি। প্যাসিফিক আইল্যান্ডও এই কমিশনের আওতাভুক্ত ছিল।
ফিলাডেলফিয়া সিটির ডেপুটি মেয়র হন ২০১৫ সালে। ফলে রাজনীতিতে সক্রিয় ড. নীনা আহমেদ রাজ্যে তার রাজনৈতিক কার্যক্রমের বিস্তৃতি ঘটান। ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা হিসেবে অন্যান্য রাজ্যেও তিনি সক্রিয়ভাবে কাজ করেন। ২০১৮তে তিনি রাজ্যের লে. গভর্নর পদে প্রার্থী হন। তার জয় নিশ্চিত জেনে প্রতিপক্ষ প্রার্থী আদালতের মাধ্যমে নির্বাচনী এলাকা পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়। নীনা আহমেদ হয়ে যান এলাকাবিহীন প্রার্থী। এতে করে তাকে পরাজিত হতে হয়। কিন্তু রাজনীতিতে অদম্য এই বাংলাদেশি আমেরিকান তার কার্যক্রমকে আরও জোরদার করেন ফলে ২০২০ সালের এই নির্বাচনের মাধ্যমে আমেরিকায় বাংলাদেশিদের অবিসম্বাদিত নেতা হবার সৌভাগ্য লাভ করেছেন।
বাংলাদেশি আমেরিকান ড. নীনা আহমেদের স্বামী বাংলাদেশি বংশোদ্ভ‚ত আহসান নসরুল্লাহ। তিনি ফিলাডেলফিয়ার একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। স্বামী ব্যবসায় সফল হলে ড. নীনা আহমেদ চাকরি ছেড়ে দিয়ে পূর্ণোদ্যমে রাজনীতিতে অংশ নেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ২০২০ সালের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের নির্বাচনী মোর্চায় কাজ করেছেন। পেশাজীবী হিসেবে তিনি ইউলস আই হসপিটাল ও থমাস জেফারসন মেডিকেল কলেজে বিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করেছেন।
ড. নীনা আহমেদ শুধু রাজনীতিবিদ কিংবা পেশাজীবী হিসেবে ওষুধ শিল্পের বিজ্ঞানীই নন, তিনি একজন গবেষকও। মার্কিন জীবনের কল্যাণ চিন্তার ওপর অনেক গবেষণা-কর্ম রয়েছে তার। ব্যক্তিগতভাবে বাংলা ভাষার সাহিত্যসহ অন্যান্য ভাষার সাহিত্যের প্রতিও তার রয়েছে গভীর অনুরাগ। বাংলাদেশে থাকাকালীন মেধাবী ও সুদর্শনা ছাত্রী নীনা আহমেদ সুন্দরী লাক্স প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ‘রানার্স আপ’ হয়েছিলেন। তিনি রাজনৈতিক জীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও সৌন্দর্য চর্চা করেন। তিনি মনে করেন, সৌন্দর্য সচেতনতা মানুষকে কাজের অনুপ্রেরণা এনে দেয়।

ড. নীনা আহমেদ ব্যক্তিগতভাবে খুবই নিরহঙ্কারী ও বন্ধুবৎসল। বাংলাদেশ কমিউনিটিতে তার জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী। কারণ, তিনি সবসময় মানুষের কল্যাণ চিন্তা করেন। শত ব্যস্ততার মাঝেও বাংলাদেশিদের বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনে অংশ নেন এবং বাঙালি সংস্কৃতিকে গুরুত্বপূর্ণভাবে উপস্থাপন করেন। নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের সব সময়েই স্মরণ করিয়ে দেন, নিজেদের শেকড়ের কথা বাংলাদেশের কথা।
বাংলাদেশের বর্তমান উন্নয়ন ধারা তাকে আপ্লুত করে। তিনি গর্ব অনুভব করেন। তিনি আশাবাদী সকল সঙ্কট ও দলীয় হীন মানসিকতা কাটিয়ে বাংলাদেশ হয়ে উঠবে মানবিক একটি রাষ্ট্র। এখানে আইন ও বিচারিক শাসনের উন্নয়ন ঘটবে।
তিনি মনে করেন, পেনসেলভেনিয়ার মানুষজন যে পরিবর্তন চায়- এই নির্বাচন তার প্রমাণ। তিনি এই অঙ্গরাজ্যের অর্থনীতি, পুলিশি সেবা ও বিচার ব্যবস্থা পুনর্গঠনের আশ্বাস দিয়েছেন। বাংলাদেশি আমেরিকান এই নারী ব্যক্তিত্ব বর্ণবাদ-বিরোধী নেতা হিসেবেও সমাদৃত।
ড. নীনা আহমেদ আমেরিকার মূলধারার রাজনীতিতে নিজের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করতে সক্ষম হবেন- এ প্রত্যাশা সবার।
অর্থকণ্ঠ প্রতিবেদক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button